মেঘনা নদীতে চলছে বালুখেকোদের তাণ্ডব
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০১-১১-২০২৬ ০৩:২৪:১৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-১১-২০২৬ ০৩:২৪:১৬ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
কোনও ধরনের সরকারি ইজারা ছাড়াই প্রভাব খাটিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি বালুখেকো মহল। প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে নদীর চর ও কৃষিজমিসহ বিভিন্ন স্থান থেকে লাখ লাখ ঘনফুট বালু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে তারা। এ অবস্থায় কৃষিজমিসহ নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছেন অন্তত ১০টি গ্রামের বাসিন্দারা।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারাদার প্রতিষ্ঠানটি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলনের ইজারা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থেকে অবৈধভাবে বালু কেটে নিচ্ছে। অবৈধ এই বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনকে জানিয়েও প্রতিকার মেলেনি। শুধু তাই নয়, স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করতে গেলে ইজারাদারের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সরাইলের পাকশিমুল ইউনিয়নের বরইচাড়া এলাকায় বিস্তীর্ণ চরের গা ঘেঁষে অর্ধশতাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শত শত বালুবাহী নৌযান বালু সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছে। যেন কোনও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কাই নেই। সীমানা পেরিয়ে চরের জমি কেটে নেয়ায় নিঃস্ব হওয়ার পথে শতাধিক কৃষক। এ ছাড়া অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী ভাঙনকবলিত গ্রামের বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিলে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলনের ইজারা পায় মো. শফিকুল ইসলাম পরিচালিত শফিক ট্রেডার্স। ইজারার শর্ত অনুযায়ী, ভৈরবের টুকচানপুর, লুন্দিয়া ও সাদেকপুর অংশে বালু উত্তোলনের কথা। অথচ মহলটি প্রভাব খাটিয়ে সীমানা পেরিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের পাকশিমুল ইউনিয়নের বরইচাড়া এলাকায় প্রবেশ করে চরের জমিসহ আশপাশের এলাকা কেটে নিচ্ছে।
এতে বড়ইচারা, রাণীদিয়া, রাজাপুর, কাকরিয়া, কালিশিমুল, পরমানন্দপুর, হরিপুর, নরসিংহপুর, আজবপুর, ফতেহপুর ও ষাইটবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দারা নতুন করে ভাঙনঝুঁকিতে পড়েছেন। একই সঙ্গে জমি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে কয়েকশ কৃষক।
এ বিষয়ে গ্রামবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকসহ সরকারি উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ করেও কোনও প্রতিকার পাচ্ছেন না। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙনকবলিত গ্রামের চরাঞ্চলের জমি, আশপাশের জনবসতি, স্থাপনাসহ নদীর তীর নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
গ্রামবাসী প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালী মহলটি আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। ফলে ভয়ে কেউ নিজের জমি রক্ষার জন্য জমির কাছে যেতে পারছেন না। এ অবস্থায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সরকারি পর্যায়ে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ না নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইসমাইল মিয়া বলেন, ‘বালুখেকো দলটি প্রতিদিন ভোররাত থেকে বালু উত্তোলন শুরু করে। কোনও সরকারি ইজারা নেই, অথচ আমাদের কৃষিজমিসহ নদীর চর কেটে নিচ্ছে। চরের মধ্যে আমরা ধান, আলু, বাদামসহ বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করে থাকি। যেভাবে কেটে নিচ্ছে, তাতে চর থাকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। তাদের বাধা দিতে গেলে তারা বন্দুক ও অস্ত্র নিয়ে তাড়া করে।’
বৃদ্ধ শহিদ মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের রক্ষা করার জন্য কেউ নেই। প্রশাসনও এগিয়ে আসে না। আমরা গ্রামবাসীরা বাধা দিতে গেলে বালুমহালের লোকজন স্পিডবোট নিয়ে তাড়া করে এবং আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ভয় দেখায়। আমাদের জমিজমা কীভাবে রক্ষা পাবে, তা বুঝতে পারছি না।’
প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে গ্রামবাসীর পক্ষে অভিযোগকারী মুফতি ফয়জুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মো. মামুন মিয়া, জিল্লু মিয়াসহ তাদের লোকজন ইজারাদার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে প্রতিদিন নির্বিচারে অবৈধভাবে লাখ লাখ ঘনফুট বালু কেটে নিয়ে যাচ্ছে। যার আর্থিক মূল্য তিন কোটি টাকারও বেশি। এভাবে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করতে থাকলে কৃষিনির্ভর গ্রামগুলোর বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানির নিচে বিলীন হয়ে যাবে। এতে গ্রামবাসী জীবিকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবেন। কারণ, এই প্রান্তিক অঞ্চলে তাদের আয়ের আর কোনও উৎস নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিকার পেতে আমরা গ্রামবাসী জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি ও অভিযোগ দিয়েছি। প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও কোনও কার্যক্রম নেই। বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় প্রভাবশালী মহলটি দেদারসে রাতদিন সমানতালে সীমানা পেরিয়ে সরাইলের অংশে প্রবেশ করে বালু লুট করছে। আমরা হাজার হাজার গ্রামবাসী এখন শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছি।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইজারাদার শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি নিয়ম মেনেই ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান থেকে বালু উত্তোলন করছেন। তিনি কোনও নিয়ম ভঙ্গ করেননি। সরাইল থেকে তার লোকজন বালু উত্তোলন করেনি। বরং ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে অন্য একটি মহল সরাইল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে তাদের ওপর দায় চাপাতে চাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমি চাই, যেখানেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হবে, প্রশাসন যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। প্রয়োজনে আমিও সহায়তা করব।’
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাজুড়ে কোথাও কোনও বালুমহাল সরকারিভাবে ইজারা দেয়া হয়নি। অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, যেন যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। একই সঙ্গে যেহেতু ইজারাদার প্রতিষ্ঠান বিধিমালা ভঙ্গ করছে, তাই ইজারা বাতিল করার জন্য সুপারিশ করেছি।’
এ দিকে ভাঙনকবলিত সরাইলের পাকশিমুলসহ আশপাশের অঞ্চলে মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন জোরালো ভূমিকা নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স